গাড়িচাপায় মরছে সংরক্ষিত বনের প্রাণী

গাড়িচাপায় মরছে সংরক্ষিত বনের প্রাণী
গাড়িচাপায় মরছে সংরক্ষিত বনের প্রাণী

প্রধান প্রতিবেদক ॥ গাছ থেকে নেমে রাস্তায় যাওয়ামাত্রই একটি বিপন্ন মুখপোড়া হনুমান শাবককে পিষে মেরে পালিয়ে যায় দ্রুতগতির এক মাইক্রোবাস। চাপা পড়ে পায়ে আঘাত পেয়েছে সাথে থাকা মা হনুমানটিও। সে ভাঙা পা নিয়ে হাঁটু গেড়ে বসে শাবকের দেহের পাশে কাঁদতে থাকে। একজন পথচারী লাঠি দিয়ে তুলে শাবকের মৃতদেহ জঙ্গলের ঝোঁপে ফেলে দিলে সেখানেও কয়েক ঘন্টা দাঁড়িয়ে থাকে সে। এ সময় একদল হনুমান গাছের উপর থেকে চিৎকার-চেঁচামেচি করে।

গত মঙ্গলবার বিকেলে হনুমানের কান্নায় সাতছড়ির প্রাণপ্রকৃতি আবার কাঁদলো। তবে অন্যান্যবারের মতো এবারও বন বিভাগের ভাষ্য— “সড়ক পরিবহন আইনের বিধান নেই বলে স্পীড ব্রেকার নির্মাণ করা যাচ্ছে না, এজন্য প্রাণীরা দুর্ঘটনা কবলিত হচ্ছে।”

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, গত ৫ বছরে সাতছড়ি সংরক্ষিত বনের ভিতরের ঢাকা-সিলেট মহাসড়কে গাড়িচাপায় শতাধিক প্রাণী মারা গেছে। অনেক প্রাণী আহত হয়ে পঙু হয়েছে।

জাতীয় উদ্যান ব্যবস্থাপনা কমিটির সাবেক এক সদস্য বলেন, ‘কয়েক বছরের মধ্যে গাড়িচাপায় ১২ ফুট দৈর্ঘ্যরে ১টি কিং কোবরা সাপ, ১টি শঙ্খিনী সাপ, ১টি কালনাগিনী সাপ, ১টি চশমাপড়া হনুমান, একটি মুখপোড়া হনুমান, ১টি মায়া হরিণ ও কয়েকটি বানর মারা যাওয়ার পর নিজে ঘটনাস্থলে গিয়েছি। এছাড়াও অনেক প্রাণী মারা যেতে শুনেছি। ৫ বছরে মারা যাওয়া প্রাণীর সংখ্যা ১০০ ছাড়িয়ে যাবে।’

স্থানীয়দের বরাতে তিনি বলেন, “গাড়িচাপায় বানর, হনুমান, বন মোরগ, চশমা পড়া হনুমান, সজারু, বনরুই ও সাপ ইত্যাদি মারা যায়। সবচেয়ে বেশি মারা গেছে বানর। কারণ এরা রাস্তার পাশে বেশি আসে।”

৬০০ একর আয়াতনের সাতছড়ি জাতীয় উদ্যানে ১৯৭ প্রজাতির জীবজন্তু বিচরণ করে। এরমধ্যে প্রায় ২৪ প্রজাতির স্তন্যপায়ী, ১৮ প্রজাতির সরিসৃপ ও ৬ প্রজাতির উভচর প্রাণী। আরও ২০০ প্রজাতির পশুপাখি রয়েছে।

প্রাণী মারা যাওয়ার বিষয়ে ডাব্লিউসিএসের (বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ সোসাইটি) সমন্বয়কারী সামিউল মোহসেনিন বলেন, ‘বনের ভেতরে প্রায় এক কিলোমিটার রাস্তায় যানবাহনের গথিসীমা ২০ কিলোমিটার নির্ধারণ করা থাকলেও প্রয়োজনীয়সংখ্যক রোড সাইন নেই। চালকরাও বনের ভেতরে প্রাণীর প্রতি ভালবাসা প্রদর্শন করেন না। তাই দিনদিন প্রাণী মৃত্যু বাড়ছে। এ পরিস্থিতিতে রোড সাইন বাড়ানোসহ আরও প্রয়োজনীয় প্রতিকার ব্যবস্থা গ্রহণের বিকল্প নেই।’

একটি জার্মানী আন্তর্জাতিক গবেষনা সংস্থার বরাত দিয়ে সামিউল মোহসেনিন বলেন, ‘সংস্থাটি সাতছড়িতে মৃতপ্রাণীর সংখ্যা নির্ণয়েরও উদ্যোগ নিয়েছে। এখানে প্রাণীমৃত্যুর হার নিয়ে তারা উদ্বিগ্ন।’

এ ব্যাপারে বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) মীর জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ‘সাতছড়িতে মারা যাওয়া প্রাণীর সংখ্যা বলতে পারছি না। তবে অনেক প্রাণী গাড়িচাপায় মারা গেছে। এমনটি হচ্ছে সড়ক পরিবহন আইনে স্পীড ব্রেকার নির্মাণের বিধান না থাকায়।’

তবে গত কয়েক বছরের তুলনায় এবার গাড়িচাপায় প্রাণীমৃত্যুর সংখ্যা কমেছে দাবি করে তিনি বলেন, ‘পরিবেশ, বন ও জলবায়ু এবং পানিসম্পদ উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান স্যারের সঙ্গে কথা বলে কিছু একটা করার চেষ্টা করব।’

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, প্রতিদিন কয়েকশ’ বালু ও পাথরবোঝাই ট্রাক সাতছড়ি বনের ভেতর দিয়ে চলাচল করে। এছাড়াও বাস ও ট্রাক্টরসহ বিভিন্ন ধরণের যানবাহন বেপরোয়া গতিতে বনের ভেতরের সড়ক দিয়ে চলাচল করছে।