ভরা মৌসুমেও হবিগঞ্জে দেশীয় মাছের আকাল
সৈয়দ সালিক আহমেদ ॥ হাওরবেষ্টিত হবিগঞ্জ জেলায় ভরা মৌসুমেও দেশীয় মাছের যেমন আকাল দেখা দিয়েছে, দামও তেমন সাধারণ ক্রেতাদের হাতের নাগালের বাইরে।
জেলায় দেশীয় মাছের ব্যাপক চাহিদা থাকলেও অন্যান্য বছরের তুলনায় এ বছর বাজারে মাছের আমদানী কম। বিশেষ করে চাপিলা, শিং, মাগুর, শোল, গজার, বোয়াল, ভেদা মাছ চাহিদার তুলনায় অপ্রতুল।
নদী এবং হাওরের নাব্যতা কমে যাওয়া, পানি দূষণ এবং প্রজনন মৌসুমে অবৈধ জাল ব্যবহার মাছের সংখ্যা কমার বড় কারণ- মনে করছেন সাধারণ মানুষ।
জেলাজুড়ে এ পরিস্থিতি নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে। ভরা মৌসুমেও যদি দেশীয়
মাছের এমন সংকট তৈরি হয়, তাহলে ভবিষ্যতে মাছের প্রাপ্যতা ও প্রজাতি দুটিই হুমকির মুখে পড়তে পারে।
মৎস্য ব্যবসায়ীরা জানান, কয়েক বছর থেকে হাওরে পর্যাপ্ত পানি না থাকা এবং মাছের প্রজনন মৌসুমে বৃষ্টি না হওয়াতে মাছের ডিম নষ্ট হয়ে যায়। এ কারণে দেশীয় মাছের উৎপাদন কমে গেছে। এছাড়া বিভিন্ন ধরণের নিষিদ্ধ জাল দিয়ে রেনু পোনা শিকার করার কারণে হাওরে মাছ কমে গেছে। তাই তাদের বাধ্য হয়ে চড়া দামে কিনে চড়া দামে বিক্রি করতে হচ্ছে। তবে চাষের মাছের সরবরাহ বেশী।
ক্রেতাদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, গত বছরের তুলনায় এ বছর দেশীয় মাছ হাট বাজারে একেবারেই কম। তাছাড়া তুলনামূলকভাবে দাম অনেক বেশি হওয়ার কারণে অনেকে কিনতে পারছেন না। সরেজমিন শহরের চৌধুরী বাজার, শায়েস্তানগর মৎস আড়ৎ, চাষী বাজারসহ বিভিন্ন বাজার ঘুরে এ চিত্র দেখা যায়।
এদিকে গেল বছরের তুলনায় এ বছর প্রতি কেজি দেশীয় মাছের দাম একশ থেকে দেড়শ টাকা বেশী। হাওরের টেংরা মাছ এ বছর প্রতি কেজি পাঁচশ থেকে সাড়ে পাঁচশ টাকা, চাপিলা সাড়ে চারশ থেকে পাঁচশ টাকা, বোয়াল সাতশ থেকে আটশ টাকা। যা গত বছরের তুলনায় একশ থেকে দেড়শ টাকা করে বেশি বলে জানান ব্যবসায়ীরা।
দেশীয় মাছের বাজারখ্যাত চৌধুরীবাজারে একাধিক ক্রেতার সাথে আলাপকালে জানা গেছে, দেশীয় মাছ এখন বড়লোকের খাবার হয়ে গেছে। মধ্যবিত্তদের নাগালের বাইরে চলে গেছে। হাওরের কিংবা নদীর একটি বোয়াল মাছের কেজি ৭ থেকে ৮শ টাকা এবং মাগুর মাছের কেজি ৬ থেকে ৭শ টাকা। এ অবস্থায় দেশীয় মাছ কেনার সাহস করতে পারছে না মধ্যবিত্ত। অনেক সময় সন্তানদের বায়না চাষের মাছ দিয়ে পূরণ করেন।
স্থানীয় মৎসজীবীরা জানান, শহর ও উপজেলার বিভিন্ন স্থানে ড্রেনেজ ও বর্জ্য সরাসরি নদী এবং হাওরে ফেলায় মাছের প্রাকৃতিক বাসস্থান ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। বিশেষ করে নবীগঞ্জ, বাহুবল, মাধবপুর, শায়েস্তাগঞ্জ উপজেলার কিছু এলাকার শিল্পবর্জ্য নদী হয়ে হাওরে প্রবেশ করায় মাছের প্রজনন ব্যহত হচ্ছে। জেলেরা আরও অভিযোগ করেন, বর্ষা মৌসুমে প্রশাসন অভিযান চালালেও অবৈধ কারেন্ট ও চায়নাদুয়ারী জালের ব্যবহার পুরোপুরি বন্ধ করা যায়নি।
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবও হবিগঞ্জের মাছ উৎপাদনে বাঁধায় বড় ভূমিকা রাখছে। অনিয়মিত বর্ষা, সময়মত বৃষ্টিপাত না হওয়া, কখনো অতিরিক্ত বন্যা কিংবা কখনো দীর্ঘ শুষ্কতাÑ এসব কারণে নদী ও বিলের স্বাভাবিক পানি প্রবাহে পরিবর্তন এসেছে। ফলে মাছের প্রজনন সময় ও অভ্যাসেও পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। মৎস্য বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব কারণে দেশীয় প্রজাতির মাছের উৎপাদন প্রতিবছরই কমছে।
