বিদ্যালয়ে যাতায়াতের পথে মেয়েদের ভিডিও করে আপত্তিকর কন্টেন্ট

বিদ্যালয়ে যাতায়াতের পথে মেয়েদের ভিডিও করে আপত্তিকর কন্টেন্ট
বিদ্যালয়ে যাতায়াতের পথে মেয়েদের ভিডিও করে আপত্তিকর কন্টেন্ট

প্রধান প্রতিবেদক ॥ বিদ্যালয় ও কলেজে যাওয়া-আসার পথে মেয়েদের ভিডিও ধারণ করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আপত্তিকর কন্টেন্ট প্রকাশের ঘটনা হবিগঞ্জ জেলাজুড়ে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। সম্প্রতি গ্রামের চাপের মুখে এক কন্টেন্ট ক্রিয়েটরের পরিবার আদালতে এফিডেভিট দিয়ে তাকে অস্বীকার করেছেন।

শিক্ষক ও সচেতন মহল প্রশাসনের হস্তক্ষেপ দাবি করছেন। তারা বলছেন, এই ধরনের ঘটনা শুধু ব্যক্তিগত নয়, পুরো প্রজন্মের উপর মানসিক প্রভাব ফেলবে। প্রতিরোধে বিলম্ব হলে তরুণদের জন্য ভয়াবহ ক্ষতি হতে পারে।

সম্প্রতি “বনিয়াচংয়ের রুবেল খান” নামের ফেসবুক আইডি থেকে তিন স্কুলছাত্রীর একটি ভিডিও প্রকাশ পায়, যা উপজেলাজুড়ে ক্ষোভের সৃষ্টি করে। ভিডিওতে দেখা যায়, বানিয়াচং সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের তিন কিশোরী বইয়ের ব্যাগ হাতে ঝোঁপঝাড়ে ঘেরা রাস্তায় হেঁটে যাচ্ছে। কয়েকজন ছেলে উদ্ভট ভঙ্গিতে তাদের সামনে আসে, যা কিশোরীদের ভীত করে। একই আইডিতে আরও কয়েকটি ভিডিও প্রকাশিত হয়েছে।

একই ধরনের ঘটনা সম্প্রতি বাহুবল উপজেলার চরগাঁও গ্রামে ঘটে। মোশাহিদ মিয়া নামে একজন অটোরিকশা চালক কলেজছাত্রীর অজ্ঞাতসারে ভিডিও ধারণ করে ফেসবুকে ছড়িয়ে দেন। পরে বাহুবল মডেল থানা পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করে এবং ৫৪ ধারায় কারাগারে পাঠায়।

সদর উপজেলার লোকড়া গ্রামের ইংল্যান্ড প্রবাসী সোহাগ খানও কিছু স্কুলছাত্রীকে নিয়ে ভিডিও ধারণ করে আপত্তিকর গান যুক্ত করে ফেসবুকে প্রকাশ করেন। গ্রামের মেয়েদের নিয়ে কুরুচিপূর্ণ প্রচারণার অভিযোগে তোপের মুখে পড়ে তার পরিবারের কয়েকজন সদস্য আদালতে দায় অস্বীকার করেন।

এ বছরের শুরুতে জেলার একটি সরকারি বালিকা বিদ্যালয়ে দুই দল ছাত্রীর মধ্যে টিকটক ভিডিওর কারণে বিরোধ সৃষ্টি হয়েছিল। অভিভাবকরা দুশ্চিন্তায় পড়লে ম্যানেজিং কমিটি, শিক্ষক ও অভিভাবকরা আলোচনায় বসে বিষয়টি মীমাংসা করেন।

সরেজমিনে হবিগঞ্জের বিকেজিসি সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়, বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়, সরকারি মহিলা কলেজ ও বৃন্দাবন সরকারি কলেজের সামনে প্রতিদিন ছুটির সময় মোটরসাইকেল চালিয়ে ও মোবাইল ফোনে ভিডিও করতে দেখা যায় উঠতি বয়সী কিছু ছেলেকে। এ নিয়ে অভিভাবকদের মধ্যে বাড়ছে উদ্বেগ।

প্রতিদিন বিকেলে কলেজ কোয়ার্টার থেকে নারকেল হাটায় যাওয়ার পথে এই দৃশ্য চোখে পড়ে সাইফুর রহমানের। তিনি বলেন, ‘ছুটি বা পরীক্ষার সময় ছেলেদের এমন আচরণে কখনো কখনো প্রতিবাদ করতে ইচ্ছে হয়। কিন্তু তারা দলবেঁধে থাকে, পরিস্থিতি বিবেচনা করে কিছু বলা থেকে বিরত থাকি। আমার মতো আরও অনেকে একই কারণে চুপ থাকেন।’

বানিয়াচং উপজেলার শিক্ষক মোঃ আবদাল মিয়া বলেন, বানিয়াচংয়ে রুবেল খান নামের একটি আইডি থেকে কুরুচিপূর্ণ কন্টেন্ট ও স্কুলগামী মেয়েদের অনুমতি ছাড়া ভিডিও ছড়ানো গভীর উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। এটি শুধু উদ্বেগজনক ঘটনা নয়; এতে পুরো প্রজন্মের প্রতিচ্ছবি ফুটে উঠেছে। এটি নৈতিক অধঃপতন, সামাজিকভাবে নিন্দনীয় এবং আইনগতভাবে দ-নীয় অপরাধ। এমন অনৈতিকতা রোধে সামাজিক সচেতনতা জরুরী।

এ বিষয় নজরে আসার পর পুলিশ, উপজেলা প্রশাসন এবং সংশ্লিষ্ট শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের কর্তৃপক্ষকে সজাগ থাকার নির্দেশ দিয়েছেন হবিগঞ্জের জেলা প্রশাসক আবু হাসনাত মোহাম্মদ আরেফীন।

জেলা প্রশাসক বলেন, ‘এ ধরনের কয়েকটি ঘটনা আমার নজরে এসেছে। বিষয়টি উদ্বেগজনক ও নিন্দনীয়। পুলিশ, উপজেলা প্রশাসন এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোকে সতর্ক থাকতে বলেছি। পাশাপাশি সামাজিকভাবে সচেতনতা ও প্রতিরোধ গড়ে তোলাও জরুরি। সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টাতেই এ পরিস্থিতি সামাল দেওয়া সম্ভব।’

আপত্তিকর কন্টেন্ট ছড়ানো সামাজিক ব্যাধি, কঠোর প্রয়োগ চাই আইনের- উপাচার্য

সিলেট মেট্রোপলিটন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ড. মোহাম্মদ জহিরুল হক বলেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যাওয়া-আসার পথে মেয়েদের ভিডিও তুলে সামাজিক মাধ্যমে আপত্তিকর কন্টেন্ট ছড়ানো শুধু তাদের গোপনীয়তা ও মর্যাদার চরম লঙ্ঘনই নয়-এটি মানসিক ও শারীরিক ক্ষতিরও কারণ। এটি গুরুতর ফৌজদারি অপরাধ। আইনের কঠোর প্রয়োগ না থাকায় এমন অপরাধ বেড়ে চলেছে, যা নতুন প্রজন্ম- বিশেষ করে কিশোরদের সুস্থভাবে বেড়ে ওঠার ক্ষেত্রে বড় বাঁধা।

তিনি আরও বলেন, আপত্তিকর কন্টেন্ট প্রকাশের পর ভুক্তভোগী কিশোরীর আত্মহত্যার নজিরও দেশে রয়েছে। কোথাও কোথাও এসব ঘটনাকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষও ঘটে, যা সামাজিক অস্থিরতা বাড়ায়। শুধু আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের কঠোর পদক্ষেপে এ সমস্যা সমাধান সম্ভব নয়। আপত্তিকর কন্টেন্ট প্রকাশকে কেবল অপরাধ হিসেবে দেখা যাবে না, এটি সামাজিক ব্যাধি ও গভীর ক্ষত। এর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে পরিবার ও সমাজ- উভয় স্তর থেকেই।