ধুলোমাখা পাড়াগাঁয়ে নন্দিত তারকা
খোয়াই রিপোর্ট ॥ গ্রামের চারদিকে মেঠোপথ আর দীর্ঘ সরু খাল। উপরে মাথা তুলে থাকা অনেকগুলো বাঁশের সাঁকো। ধুলোমাখা এই অজপাড়াগয়ের নাম স্নানঘাট। বাহুবল উপজেলার পিছিয়ে পড়া এ গাঁয়ের উত্তরাংশে ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগে খেলা একমাত্র বাংলাদেশি বংশোদ্ভুত ফুটবল তারকা হামজা চৌধুরীর পৈতৃক ভিটা। দীর্ঘ এগারো বছর পর আরেক দফা সেই ভিটায় ফিরলেন তিনি।
এর আগে অন্তত দশবার ¯œানঘাটে আসলেও লেস্টার সিটির তারকা মিডফিল্ডার (বর্তমানে শেফিল্ড ইউনাইটেডের হয়ে খেলছেন) হামজার এবারের ফেরায় রয়েছে ব্যাপক ভিন্নতা। কারণ, এবার বাংলাদেশের জাতীয় দলের খেলোয়াড় হয়ে ফিরেছেন তিনি।
ইংল্যান্ডের যুব দলের হয়ে খেলা হামজার বর্তমান মার্কেট ভেল্যু ৪.৫ মিলিয়ন ইউরো (বাংলাদেশি মুদ্রায় সাড়ে ৫৯ কোটির বেশি)। পুরো দক্ষিণ এশিয়াতেই তার মতো দামি ফুটবলার আর নেই।
এত বড় ফুটবল মহাতারকার আগমনে পুরো দেশেই যখন উন্মাদনা বয়ে যাচ্ছে, সেখানে স্নানঘাটের অবস্থা তো কল্পনা করাই যায়। হয়েছেও তেমন কিছুই। হামজার এলাকার লোকজন অধীর আগ্রহে অপেক্ষায় ছিলেন ঘরের ছেলেকে বরণ করে নেওয়ার জন্য। এমনকি স্থানীয়রা তাকে স্বাগত জানাতে শতাধিক গেট স্থাপন করেন। প্রচণ্ড ভিড়ের কথা মাথায় রেখে পুলিশের পক্ষ থেকে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে।
ঘরের মাটিতে ছেলের অপেক্ষায় থাকা বাবা দেওয়ান মুর্শেদ চৌধুরী জানান, ইংলিশ চ্যাম্পিয়নশিপ লিগে শেফিল্ড ইউনাইটেডের হয়ে খেলে সরাসরি সিলেটের বিমানে ওঠেন হামজা। বাংলাদেশ সময় রাত ২টায় বাংলাদেশ বিমানের ফ্লাইটে ম্যানচেস্টার থেকে সিলেটের উদ্দেশ্যে রওনা হন তিনি। হামজার সঙ্গে এসেছেন তার স্ত্রীসহ পরিবারের অন্য সদস্যরাও।
দীর্ঘ ভ্রমণ শেষে গতকাল সোমবার বেলা সাড়ে ১১টার দিকে সিলেট পৌঁছান তিনি। সেখান থেকে রওনা দেন নিজ গ্রামের উদ্দেশ্যে— স্নানঘাটে। সিলেট থেকে একটি জীপ গাড়িতে করে বিকেল পৌনে ৪টায় তিনি স্নানঘাটে ফেরেন। বাড়ির পথে তাকে স্বাগত জানানো হয় মোটরসাইকেল শোভাযাত্রায়।
ভিড় ঠেলে ঢুকতে হয়েছে পৈতৃক ভিটায়। কিছুক্ষণ পর বাড়ির পেছনের মাঠে তৈরী করা ছোট্ট একটি স্টেজে উঠলেও বেশিক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকতে পারেননি তিনি। মিনিট খানেকের মধ্যেই মাইকে ‘বাংলাদেশ জিন্দাবাদ’সহ কয়েকটি বাংলা শব্দ উচ্চারণ করে ফিরে যান ঘরে।
স্নানঘাটের বাসিন্দা দোলাই মিয়া বলেন, ‘হামজা ছোটবেলায় ইংল্যান্ড থেকে দেশে ফিরলে তার সঙ্গে ফুটবল খেলতাম। আমারা দশজনেও তাঁর সঙ্গে পারতাম না। তখন ভাবতেও পারিনি হামজা এত বড় তারকা হবেন।’
আরেক তরুণ ইমন মিয়া বলেন, ‘এখন থেকে আর ব্রাজিল-আর্জেন্টিনা নয়। এখন আমরা বিশ্বকাপে বাংলাদেশের খেলার অপেক্ষায়। কারণ আমাদের হামজা বাংলাদেশকে এগিয়ে নিয়ে যাবেন।’
হামজার ফেরা উপলক্ষে তাঁর বাড়ির পেছনের মাঠে ছোট্ট স্টেজ সাজানো হয়। পরিবারের পক্ষ থেকে সেখানে স্থানীয়দের জন্য আয়োজন করা হয় ইফতারের। হামজা গতরাতে নিজ গ্রামেই আত্মীয়-স্বজনদের সঙ্গে কাটান।
পরদিন রাত ৮টা ৪০ মিনিটের ফ্লাইটে ঢাকায় গিয়ে বাফুফের ক্যাম্পে যোগ দেন তিনি। এএফসি এশিয়ান কাপের বাছাই পর্বে নিজেদের প্রথম ম্যাচে ভারতের মুখোমুখি হবে বাংলাদেশ। আগামী ২৫ মার্চ সেই ম্যাচ দিয়েই জাতীয় দলে অভিষেক হবে হামজা চৌধুরীর।
স্নানঘাটের সন্তান হামজার গায়ে দেশের জার্সি দেখতে মুখিয়ে আছেন সেখনকার বাসিন্দারা। ঘরের ছেলে দেশের মুখ উজ্জ্বল করবে এমন আশা সবার।
