স্বামী হারানো সুজিনার বাঁচার লড়াই
প্রধান প্রতিবেদক ॥ ‘আমাদের দেখাইয়্যা অনেকে অনেক কিছু পাইছে, আর আমার বাচ্চারা হারাইছে বাপডাক। আমি স্বামীহারা হইছি। আমার বাচ্চাকাচ্চার ভবিষ্যৎ সবই রইয়া গেছে।’ — বলেই চোখের কোণে জল, গলা ভার হয়ে আসে সুজিনা আক্তারের।
স্বামী মোজাক্কির মিয়া পুলিশের গুলিতে নিহত হওয়ার পর, বানিয়াচং উপজেলার এই গৃহবধূর জীবনে নেমে এসেছে নিঃসঙ্গ বাস্তবতা। সংসার বলতে দুই ছেলে আর এক বৃদ্ধা শাশুড়ি।
গত বছরের ৫ আগস্টের কথা মনে করে কাঁদতে কাঁদতে বলেন সুজিনা, ‘মোজাক্কিরের আঙুলে বিষফোঁড়া উঠছিল। আমি বলছিলাম, ডাক্তার দেখাও, আন্দোলনে যাইও না। কিন্তু শুনল না। বের হইতে হইতেই বলল, “দুপুরে এসে ভাত খাব।” ওর ভাতিজারা ফিরল, সে ফিরল না। ফোনে জানলাম— হাসপাতালে নিতে হইছে। কিন্তু গিয়ে দেখি—গুলিতে মরার লাশ।’
মোজাক্কির ছিলেন ভাঙারি ব্যবসায়ী। সাত বছরের সংসারে তিনিই ছিলেন একমাত্র উপার্জনক্ষম। তাঁর আয়ে চলত স্ত্রী, দুই ছেলে ও বৃদ্ধা মা খোশবানুর খরচ।
তার মৃত্যুর পর ‘জুলাই ফাউন্ডেশনের’ পক্ষ থেকে সুজিনার হাতে তুলে দেওয়া হয় ১০ লাখ টাকার সঞ্চয়পত্র। সরকার ও বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের পক্ষ থেকেও আসে আরও প্রায় ৮ লাখ টাকার সহায়তা।
সুজিনা বলেন, ‘সঞ্চয়পত্রের লাভে ছেলেদের স্কুলে পাঠাই, বাকী টাকায় খরচ চলছিল। কিন্তু আয় বলতে এখন কিছুই নাই। ৮ লাখের মধ্যে শাশুড়ি এক লাখ নিছে, বাকিটাও শেষ হইতেছে।’
মোজাক্কিরের বড় ছেলে মোশাহিদ (৭) দারুন নাশাত মাদরাসার প্রথম শ্রেণিতে পড়ে, আর ছোট ছেলে মোশারফ (৫) শিশু শ্রেণির শিক্ষার্থী।
সুজিনার অনুরোধ, ‘আমি কোনো চাকরি চাই না। শুধু সরকার যদি ওদের পড়ালেখার দায়িত্ব নেয়, মানুষ হইতে পারে— এইটুকুই চাই।’
শুধু লাশ না, ভেঙে গেছে এক সংসার
সরেজমিনে গত শুক্রবার নিহতের বাড়িতে গেলে কথা হয় পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে। চাচি পারুল বিবি বলেন, ‘ভালো ছেলে আছিল। যাইবার সময় বলছিল— যদি শহীদ হই, গর্বের ব্যাপার হইব। হইছে ঠিকই, কিন্তু বউমা আর নাতির জীবনে নেমছে ঘোর দুর্দিন।’
মা খোশবানু কাঁদতে কাঁদতে বলেন, ‘ঘরে আইয়া “মাই মাই” কইয়া ডাক দিত, মনটা জুড়াইত। গেছিল, আর আইল না। অহন আর কিছু কইবার নাই।’
মৃত্যুর পর থেকে মোজাক্কিরের বোন হাফিজা বেগম একটি পোশাক কারখানায় কাজ করে মায়ের দেখভাল করছেন।
৫ আগস্ট যা ঘটেছিল:
সেদিন সাগরদিঘীর পশ্চিমপাড় ঈদগাহ মাঠ থেকে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের মিছিল বের হয়। প্রায় ১০ হাজার মানুষ শহীদ মিনার অভিমুখে গ্যানিংগঞ্জ দিয়ে রওনা দেয়। পুলিশি বাধায় উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে থানার সামনে। ইটপাটকেল ছোড়ে বিক্ষোভকারীরা। পুলিশ রাবার বুলেট, কাঁদানে গ্যাস, সাউন্ড গ্রেনেড ও গুলি চালায়।
পুলিশ ও প্রত্যক্ষদর্শীদের তথ্য অনুযায়ী, সেদিন ঘটনাস্থলে ও পরে হাসপাতালে মারা যান অন্তত ৮ জন। একজন সাংবাদিক ও একজন উপপরিদর্শক (এসআই) মারা যান পিটুনিতে।
এসআই সন্তোষ হত্যার ঘটনায় পুলিশের পক্ষ, এক আহত ছাত্রের বাবার পক্ষ এবং নিহতদের পরিবারের পক্ষ থেকে মোট তিনটি মামলা হয়েছে। আসামির তালিকায় আছে ১০ হাজারের বেশি নাম।
নিহতদের মধ্যে ছিলেন:
বানিয়াচংয়ের ভাঙ্গারপাড়ের ছানু মিয়ার ছেলে হোসাইন মিয়া, জাতুকর্ণপাড়ার আব্দুন নূরের ছেলে আশরাফুল ইসলাম, আব্দুর রউফ মিয়ার ছেলে তোফাজ্জল হোসেন, পাড়াগাঁওয়ের শমসের উল্যার ছেলে মোজাক্কির মিয়া, পূবগড়ের ধলাই মিয়ার ছেলে সাদিকুর রহমান, কামালখানীর মৃত আলী হোসেনের ছেলে শেখ নয়ন হোসেন, সাগরদিঘীর পূর্বপাড়ের মোশাহিদ আখঞ্জীর ছেলে সোহেল আখঞ্জী, চানপুরের মৃত তাহের মিয়ার ছেলে আকিনুর রহমান ও খন্দকার মহল্লার আবুল হোসেনের ছেলে আনাস মিয়া।
