মাধবপুরে নারীকে ‘পুলিশি হেনস্থা’, গ্রেপ্তার করে মারপিট
স্টাফ রিপোর্টার ॥ মাধবপুরে তল্লাশি পরোয়ানা তামিলে গিয়ে পুলিশ সদস্যরা এক নারীকে জাপটে ধরে মোবাইল ফোন কেড়ে নেওয়ার সময় গ্রেপ্তার করা ওই নারীর দুই স্বজনকে আদালত জামিনে মুক্তি দিয়েছেন। হবিগঞ্জের সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মোঃ শাফি উল্যাহ গত রবিবার ওই দুইজনের জামিন মঞ্জুর করেন।
পুলিশ সদস্যরা তল্লাশি পরোয়ানা তামিলে গিয়ে নারীকে ঝাপটে ধরে মোবাইল ফোন জব্দ এবং রক্তাক্ত জখম করলে, আইনজীবীরা আদালতে এই ঘটনার বর্ণনা দেন। বিচারক তা বিবেচনা করে জামিন মঞ্জুর করেন।
এর আগে, ১৫ অক্টোবর মাধবপুর উপজেলার চৌমুহনী ইউনিয়নের গাজীপুর গ্রামে আবুল কালামের ছেলে আকিল মিয়ার বাড়িতে এ ঘটনা ঘটে। পরে শিক্ষার্থী ও নারীসহ ১৫ জনের বিরুদ্ধে পুলিশ হত্যার চেষ্টার অভিযোগে মামলা দায়ের করলে, কয়েকটি পরিবার গ্রেপ্তারের ভয়ে আত্মগোপনে চলে যায়।
জামিন পাওয়া আসামীরা হলেন, আকিলের ভগ্নিপতি মহিবুর রহমান ও নিকটাত্মীয় শ্যামল মিয়া। আদালতে তাঁদের পক্ষে আইনজীবী ছিলেন ত্রিলোক কান্তি চৌধুরী বিজন ও সিরাজুল ইসলাম।
সিরাজুল ইসলাম বলেন, “পুলিশ সদস্যরা তল্লাশি পরোয়ানা তামিলে গিয়ে নারীকে ঝাপটে ধরে মোবাইল ফোন জব্দ এবং রক্তাক্ত জখম করলে, আমরা সংবাদপত্রসহ অন্যান্য প্রমাণ আদালতে দাখিল করে সেই ঘটনার বর্ণনা দেই। বিচারক তা বিবেচনা করে জামিন মঞ্জুর করেন।”
কারাগার থেকে মুক্তির পর মহিবুরের শরীরে ফুলে যাওয়া জখমের দাগ দেখা গেছে। তিনি খোয়াইকে বলেন, “দুই আসামিকে গ্রেপ্তারের পর গাড়িতে তোলার সময়ই পরপর লাঠিচার্জ করা হয়। পরে থানার ভেতরে নিয়ে আমাদের মাথা নিচু করে কোমর উঁচু অবস্থায় মারধর করা হয়।”
প্রসঙ্গত, আদালতের তল্লাশি পরোয়ানা তামিল করতে সেদিন কাশিমনগর পুলিশ ফাঁড়ির এসআই মিজানুর রহমান অভিযানে যান আকিল মিয়ার বাড়িতে। সঙ্গে ছিলেন কনস্টেবল শরীফ আহমদ বাবু, শাহেদ আহমেদ, নাহিদুল করিম, স্বজল কান্দি দত্ত ও সোহেল মিয়া।
সিসিটিভির ফুটেজে দেখা যায়, আকিলের বোন সোনিয়া ডান হাতে মোবাইল ফোন ধরে রেখে ঘটনাস্থলের দিকে যাচ্ছিলেন। তখন এসআই মিজানুর তার দিকে তেড়ে গেলে তিনি ফোনটি লুকিয়ে ফেলেন। এ সময় মিজানুরসহ আরও দুইজন পুলিশ তার সাথে ধস্তাধস্তি শুরু করেন। পরে মেয়েটি সামনের দিকে এগোনোর চেষ্টা করলে তারা মোবাইল ফোনটি জোর করে ছিনিয়ে নেন। এ সময় সোনিয়া এসআই মিজানুরের শরীরে তার হাত দিয়ে আঘাত করেন এবং পরে একটি ঝাড়– হাতে তেড়ে আসেন। পরে সাদা পোশাকের কয়েকজন পুলিশ সদস্য বাসার ভেতরের সব সিসি ক্যামেরার তার ছিঁড়ে ফেলে রেকর্ডারটি (ডিভিআর) হাতে করে নিয়ে যান।
এ সময় পুলিশ ঘটনাস্থলে উপস্থিত লোকদের উদ্দেশ্যে অশ্রাব্য ভাষায় গালাগালি করেন বলেও জানান স্থানীয়রা। এতে গ্রামের শতাধিক নারী-পুরুষ সঙ্গে যুক্ত হয়ে বাদানুবাদে জড়িয়ে পড়েন এবং হাতাহাতির ঘটনা ঘটে।
পরে এসআই মিজানুর রহমান আকিল ও তাঁর ভগ্নিপতি এবং চার ভাইবোনসহ ১৬ জনের বিরুদ্ধে পুলিশ হত্যাচেষ্টার অভিযোগে মামলা দায়েরন এবং ঘটনার সময়ই দুইজনকে গ্রেপ্তার করে নিয়ে যান।
মামলায় অভিযোগ করা হয়েছে, আদালতের আদেশে দ-বিধির ১০০ ধারার বিধান মোতাবেক আকিলের ৪০ দিনের শিশু সন্তানকে উদ্ধার করে তার স্ত্রীর কাছে দিতে গেলে নামীয় আসামিসহ প্রায় ২৮ জন লাঠিসোটা নিয়ে পুলিশের ওপর হামলা চালায়। এতে কয়েকজন পুলিশ সদস্য আহত হন। পরে অতিরিক্ত পুলিশ গিয়ে তাঁদের উদ্ধার করে মাধবপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে পাঠায়।
তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করে গ্রেপ্তার মহিবুরের স্ত্রী সাবিনা বেগম খোয়াইকে বলেন, “আমার স্বামী সেদিন পিত্রালয়ে টেলিভিশন দেখছিলেন। শিশুটিকে নিয়ে পরিবারের অন্য সদস্যরা চিকিৎসকের কাছে ছিলেন। খালি বাড়িতে তাঁকে একা পেয়ে এসআই মিজানুর তার সঙ্গে অশোভন আচরণ ও মারধর করেন।”
তিনি আরও বলেন, “এ খবর পেয়ে আমার বোন সোনিয়া প্রবাসে থাকা স্বামীর সঙ্গে ভিডিও কলে কথা বলা অবস্থায় ঘটনাস্থলের দিকে দৌড়ে যান। তখন এসআই মিজানুর বলেন, ‘তুই ভিডিও করছিস কেন?’ সোনিয়া জানান, ‘ভিডিও করি না স্যার, স্বামীর সঙ্গে কথা বলছি।’ এরপর তিনি মোবাইল ফোনটি জামার ভেতরে রাখেন। তখন এসআই মিজানুর ও আরও দুজন পুলিশ সদস্য তাকে ধাওয়া করে জোর করে সেখান থেকে মোবাইলটি নিয়ে নেন।”
সাবিনা দাবি করেন, “এ সময় আমার বোন প্রতিবাদ করলে পুলিশ তার শরীরে হাত দেয়। পরে তারা মিলে আমার স্বামীসহ দুইজনকে ধরে নিয়ে যায় এবং আমাদের মারধর করে। যাওয়ার আগে ঘরের সিসি ক্যামেরার সংযোগ ছিঁড়ে ফেলে, ডিভিআরসহ সোনিয়ার মোবাইল ফোনটিও নিয়ে যায়।”
আকিলের স্ত্রী নাজমা আক্তার বৃষ্টি আদালতে করা মামলায় অভিযোগ করেছিলেন, ৪০ দিনের নবজাতক সন্তান রেখে স্বামী আকিল মিয়া তাঁকে মারধর করে বাড়ি থেকে বের করে দিয়েছেন। তবে এ অভিযোগ ‘মিথ্যা ও মনগড়া’ দাবি করেছেন আকিলের বোন সাবিনা। তিনি বলেন, “আমার ভাই স্ত্রীকে তাড়িয়ে দেয়নি। সে অনেক বছর ধরে ফ্রিল্যান্সিং করে ভালো উপার্জন করছিল। সেই টাকাগুলোই তার স্ত্রী বৃষ্টি হাতিয়ে নিয়েছেন। দাম্পত্য কলহও চলছিল কিছুদিন ধরে।”
সাবিনা আরও বলেন, “সম্প্রতি তালাকের ব্যাপারে দুইপক্ষে কথা চলছিল। কিছুদিন আগে বৃষ্টির পিত্রালয়ে একজন মারা গেলে সে সেখানে যায়। এরপর আর ফিরে না এসে উল্টো মিথ্যা মামলা দায়ের করে। শিশুটিকে নিয়ে আমরা বিপাকে ছিলাম। আমরা চেয়েছিলাম যা হবার আইনের মধ্য দিয়ে হোক। তবে নবজাতক যেন মায়ের কাছেই থাকে, কিন্তু বৃষ্টি নিজে তা চাননি। উল্টো পুলিশকে দিয়ে হেনস্থা করিয়েছেন।”
নারীর গায়ে হাত দেওয়া আইনবিরোধী কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে অভিযুক্ত এসআই মিজানুর রহমান খোয়াইকে বলেন, “ঘটনাস্থলে পরিস্থিতি তখন অত্যন্ত উত্তপ্ত ছিল। আসামীরা উশৃঙ্খল আচরণ করছিলেন, আমাদের ওপর হামলা চালানো হয়। আত্মরক্ষায় আমরা প্রতিরোধে বাধ্য হই। আসামিদের কারণে এলাকাবাসী অতিষ্ঠ, তারা পুলিশের ওপরও হামলা করতে দ্বিধা করেনি।”
পুলিশের মামলার নামীয় আসামীরা হলেন, শাকিল মিয়া, আকিল মিয়া, সোনিয়া বেগম, মহিবুর রহমান, শ্যামল মিয়া, রোকেল মিয়া, রাব্বী মিয়া, কামাল মিয়া, মামুন মিয়া, বিজয়, সাবিনা বেগম, রেহেনা আক্তার, তাসলিমা আক্তার, ফারজানা আক্তার বর্ষা, নয়ন পারভেজ ও বিলকিস।
